সকাল সাড়ে সাতটায় বাড়ী থেকে বেড়িয়ে রাত দশটায় বাড়ী ফিরলে নিজেকে একটা বোধশূন্য যান্ত্রিক মানব টাইপের কিছু মনে হয় ৷ নিজের দুঃখে নিজেকেই শান্তনা দিতে ইচ্ছে করে, “আমি তো লিফটে উঠি নাই, লিফট আমার উপরে উঠেছে ৷” – with Thyself at Matuail Jungle Bari

View on Path

Advertisements

একটি গ্রীষ্মের মধ্যদুপুরের স্বপ্ন

গল্পের শুরুতে ছেলেটার মন খুব খারাপ ছিল। মাথাটা’ও প্রচন্ড ব্যাথা করছিল আজ। তাই কোন কাজ না করে চুপচাপ অফিসের ডেস্কে বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো। এমন সময় মেয়েটা এসে একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছেন? – এই তো ভালো। বলেই ছেলেটা আবার ডেস্কে মাথা গুজলো। ইদানিং বেশ লক্ষ্য করছে মেয়েটা কারণে অকারণে তার কাছে আসছে এটা ওটা সমস্যা নিয়ে। ছেলেটাও মনে মনে প্রতিদিনই মেয়েটার জন্যে যেন অপেক্ষা করে থাকে। নাহ! শুরুটা ঠিক মনের মতো জমলো না। কেমন যেন আবেগহীন মনে হলো…….যাক শুরু যখন করলাম’ই শেষও করতে হবে। মেয়েটা যখন দ্বিতীয়বারের মতো ছেলেটার কাছে এসে একটা সমস্যার সমাধান চাইলো, ছেলেটা হঠাৎ বলে উঠলো, – চলো কোথাও বেড়িয়ে আসি আজ। -কোথায়? কেন? এই সময় কিভাবে? – এখন না তো, বিকেলে। সময় করে নিতে হবে। আজ খুব ঘুরতে ইচ্ছে করছে। অনেকদিন যাবত পিসি আর মোবাইলের সাথে থেকে থেকে একেবারে যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি। – ঠিক আছে! তবে কোথায় যাব, সেটা কিন্তু আমি ঠিক করবো। ছেলেটা আর কোন কথা না বাড়িয়ে আবার ডেস্কে মাথা গুজে এবার নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়েই পরলো। কর্পোরেট জীবনে এটাই তার প্রথম কর্মস্থলে ঘুমানো। ছোট খাটো একটা স্বপ্নও দেখে ফেললো। – হ্যালো! তুমি কোথায়? – এই তো, মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম। – আমি নীচে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি, তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু! ঠিক সময়ে বাড়ী যেতে না পারলে সমস্যা হবে। গল্পের এই অংশটাতে ছেলেটা একটু অজুহাত দেখিয়ে কর্মস্থল থেকে তাড়াতাড়ি করে বাইরে বেড়িয়ে অপেক্ষারত মেয়েটার দিকে যাবে। মেয়েটা স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে ছেলেটাকে নতুন জীবনে বরণ করে নিবে। গত পাঁচ বছর একসাথে কাটিয়ে এই জীবনের আজ নব জন্ম হলো। মেয়েটার ফর্সা মুখে কেমন লজ্জার একটা রঙিণ আভা ছেলেটার চোখ এড়িয়ে গেল। একটু লক্ষ্য করলে হয়তো ছেলেটা টের পেত মেয়েটা প্রচন্ড লজ্জা পাচ্ছে। জীবনে কখনো সে এভাবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কোন ছেলের সাথে বাইরে বেড়াতে যায়নি। এই ছেলেটা একটু পাগলাটে স্বভাবের। কথাবার্তায় কোন রাখঢাক নেই। যখন যা মনে আসে মুখে বলে উঠতে ছেলেটার কোন দ্বীধা হয় না। এই স্বভাবের কারণে ছেলেটাকে কর্মস্থলের অনেকেই খুব এড়িয়ে চলে। কখন কোন প্রসংগে কাকে কি বলে ফেলে! এমন লোকের কাছ থেকে দূরে থাকাটাই ভালো। তবে ছেলেটা কাজে খুব পারদর্শী। সারা অফিসের সবাই যেখানে ব্যর্থ হবে, ছেলেটা অনায়াসে সেই কাজটা করে ফেলবে হাসতে হাসতে, কৌতুক করতে করতে। এ বিষয়ে ছেলেটার কোন জুড়ি নেই। যারা জুড়ি হতে চেয়েছিলো, সবাই ব্যর্থ হয়ে নুড়ি পাথরের মতো ঝরে পড়েছে। ধ্যাৎ আবার অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি……. কোন গাড়ীতে উঠবে এটা নিয়ে ছেলেটা আর মেয়েটা দোমনায় ভুগতে লাগলো। ছেলেটা লোকাল বাসে একেবারেই উঠতে পারে না। কেমন বমি বমি লাগে। সে বললো, – চলো রিক্সায় করে হাওয়া খেতে খেতে চলে যাই তুমি কোথায় নিয়ে যাবে। – না! এতো খরচ করাটা ঠিক হবে না। বরং আমরা বাসে গেলেই তাড়াতাড়ি সেখানে পৌঁছতে পারব। প্রায় তেরো বছর পর ছেলেটা আজ কারো সাথে ঘুরতে বেড়িয়েছে, তাই তার সাথের মানুষটার মন খারাপ না করে বাসে চড়তেই রাজি হয়ে গেল। তবে দু’জনে আলাদা আলাদ বসলো। ছেলেটা ইচ্ছে করেই মেয়েটার থেকে দূরে বসলো। তার মনে হচ্ছিলো তাদের দু’জনকে ঠিক একসাথে মানাচ্ছে না………….. গল্পের এই পর্যায়ে ছেলেটা আর মেয়েটা একটা বিশাল অট্টালিকায় দশ তলার ছাঁদের উপর খোলা আকাশের নীচে একটা রেস্টুরেন্টে বসে নিমকি চিবোচ্ছে। মেয়েটা কিছুক্ষণ পর পর এটা সেটা এনে দিচ্ছে রেস্টুরেন্টের কাউন্টার থেকে। সে আজ হোস্ট। এতো শখ করে ছেলেটাকে এই জায়গাতে নিয়ে এসেছে, অন্তত: জায়গাটার সম্মান তো রাখতে হবে। আতিথেয়তার কোন অভাব হচ্ছে না। চা’য়ে ভিজিয়ে নিমকি খাচ্ছে আর অযথা’ই গল্প করছে, ঐ পাশের বিল্ডিংটা এই রঙের না হয়ে সেই রঙের হলে ভালো হতো। রাস্তাটা কি সুন্দর পরিস্কার দেখাচ্ছে দশ তলার উপর থেকে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তাদের চোখ দু’টো যেন আলাদা আলাদা গল্পে মশগুল। তারা বলছে অন্য কথা, – তুমি আমাকে কেন এখানে আনলে? – তুমি কি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো? – সে’টা কি বেশী অপরাধ হয়ে যাবে?……… ইত্যাদি ইত্যাদি। এক সময় ছেলেটারই ধ্যান ভাঙলো। সে বুঝতে পারলো এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে একটা দুর্ঘটনা ঘটবেই নিশ্চিত। ঠিক এমন সময় তাদের পাশ দিয়ে একটা যুগল গিয়ে একেবারে শেষের টেবিলটায় জোড় বেধে বসে গাঁদা ফুল নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করলো। মেয়েটা তখন ইশারায় ছেলেটাকে দেখিয়ে বললো, – দেখেছেন? – হুম! দেখলাম তো। – আমি যতবার এখানে এসেছি, ততবারই এই জুটিকে ঠিক এই জায়গাতে এভাবেই দেখি..হা: হা: – এতে হাসির কি আছে? আমাদের মনে কোন আবেগ নেই দেখে অন্যেরও কি থাকতে পারবে না? – স্যার বলেছে এখানে রোমান্স করতে কোন বাধা নেই। মুচকি হেসে বললো মেয়েটা। ছেলেটা এবার একটু বিব্রত হয়ে চিন্তা করতে লাগলো এখানে কে কাকে পটাচ্ছে বোঝা মুশকিল। তার বার বার ইচ্ছে করছিলো মেয়েটার লিপস্টিকটা একবারে ধুয়ে সাফ করে দিতে। যখন তার বিবেক বাধা দিলো, তখন বললো চলেন নীচে একটা লাইব্রেরী দেখলাম, সেটাতে গিয়ে দেখি কোন পড়ার মতো বই পাওয়া যায় কি না? তারা উঠে গেল। খাবারের বিল’টা মেয়েটাই দিল। গতকাল বেতন পেয়েছে, আজ তার পার্স কানায় কানায় পূর্ণ। লাইব্রেরীতে গিয়ে সেখানেও তারা দুজন বই খোঁজার ফাঁকে ফাঁকে একজন আরেকজনকে স্পর্শ করায় মনোযোগী হয়ে উঠছিলো ৷ ছেলেটার বারবার মনে হচ্ছিলো এই বুঝি তার সংযমের বাধ ভেঙে গেল, এই বুঝি…… এমন দোটানায় থাকতে থাকতে হঠাৎ ছেলেটা বঙ্কিমচন্দ্রের একটা বই নিয়ে আবৃত্তি করার মতো করে পড়তে লাগলো আর তার অর্থগুলো মেয়েটাকে তরজমা করে বোঝাতে লাগলো ৷ বোঝা গেল সাধু ভাষায় ছেলেটার দখল মোটামুটি খারাপ না ৷ গল্পটার সারমর্ম এই যে, “প্রতিটি মানুষই রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা, অহংকার প্রভৃতি রিপুর দ্বারা প্রভাবিত হয় ৷ অনেক বিদ্যানও এর ব্যাতিক্রম না ৷ যারা এই রিপুকে দমন করে চলতে পারেন, তারাই মহৎ ৷” সঠিক সময়ে ছেলেটা সঠিক বইটা’ই বেছে নিয়েছিলো ৷ তারা দুজনেই মহৎ মানুষ ৷ তারা দু’জনেই সেই প্রকৃতি প্রদত্ত রিপুর কাছে নত হতে গিয়েও পরক্ষণেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে কুপ্রবৃত্তিগুলোকে জয় করতে সমর্থ হয়েছে ৷৷ নাহ! গল্পটা আজ ঠিক জমে উঠছে না ৷ আসলে শরীরটা আজ এতো দুর্বল হয়ে পরেছে যে, বার বার লেখায় ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে ৷ যা গরম পরেছে গত কয়েকদিন ধরে ৷ নাহ! গল্পটা আবার নতুন করেই শুরু করতে হবে ৷